সোমবার ১৫ জুলাই ২০২৪
Online Edition

নামে কী আসে যায়? 

নূরুন্নাহার নীরু

কথায় আছে "নামে কী বা আসে যায়?" শিল্পীরা গায়: নামের বড়াই করো নাকো নাম দিয়ে কী হয়/নামের মাঝে পাবে নাকো আসল পরিচয়! এই' নাম' শব্দটি নিয়ে আরো কতনা গান আছে, কবিতা আছে, গল্প আছে।  কিন্তু এই নাম' শব্দটির অর্থ, তাৎপর্য, তাছির বা  ফলাফল নিয়ে কেউ কি কখনো ভেবেছি? এই যেমনঃ ১/ নাম শব্দের অর্থ কী? উত্তরঃ আখ্যা, অভিদা, সংজ্ঞা ইত্যাদি। (সূত্র : ইন্টারনেট)

২/ নাম কিসের প্রতীক? উঃ আমাদের নামগুলো আমাদের ব্যক্তি পরিচিতির একটা গভীর তাৎপর্য বহন করে কেননা এর মাধ্যমেই আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সাংস্কৃতিক এমনকি ঐতিহাসিক সংযোগও সংস্থাপিত ও বহনযোগ্য  হয়। এই নামই আমাদেরকে আমরা কে বা কারা, আমরা কোন সম্প্রদায়ের এমনকী বিশ্বে আমাদের অবস্থান কোথায় তাও নির্দেশ করে থাকে।

 ৩/ নাম বলতে কী বুঝায়? উঃ নাম হচ্ছে একটি বিশেষ্য। সাধারণত কোন কিছুকে পৃথকভাবে পরিচিত করতে বা পার্থক্য করতে অবশ্যই নির্দিষ্ট নামের প্রয়োজন পড়ে। নাম দ্বারা কোন কিছুর শ্রেণি বা বিষয় নির্ধারণ করা যায়। মূলত কোন ব্যক্তির নামই তার পরিচিতি হিসেবে তাঁকে শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 

৪/ নামের গুরুত্ব আছে কি? উঃ নাম বিহীন কাউকে যেমন শনাক্ত করা সম্ভব নয় তেমনি তাঁকে উপস্থাপনও অসম্ভব। যেমন, "আমি কে?"  বা "তুমি কে?" এ সব ধরনের  প্রশ্নের উত্তরে যে ব্যক্তিগত প্রোফাইল তুলে ধরা প্রয়োজন তার মধ্যে সবার আগে এবং স্পষ্টভাবেই থাকবে নিজ নিজ নামটাই। হতে পারে সে নাম খুবই অর্থবোধক কিংবা অর্থহীন আজে বাজেও যেমন ,নান্টু, পল্টু, বিল্টু ! সে যা ই হোক তবুতো ধরে নেয়া যাবে ঐ নামের ব্যক্তিটিই। এজন্যই নাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সকল সময়ে, সকলের জীবনে।

একবার জাবির বিন আব্দুল্লাহ ((রাঃ)) রাসূল (সাঃ) এর দরজায় কড়া নাড়লেন কোন একটা বিশেষ প্রয়োজনে রাসূল (সাঃ) এর সাক্ষাৎ পেতে। দররজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে রাসূল (সাঃ) বললেন, "দরজায় কে?" জাবির (রাঃ) বললেন, "আমি, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)।" রাসূল (সাঃ) তখন ভেতর থেকে বললেন, "আমি ও তো আমি। আমি মানে কে?" (সহীয় বুখারী : এ৬২৫০, সহীয় মুসলিম : ২১৫৫) এ ঘটনা থেকে জাবির (রাঃ) বুঝে গেলেন যে, তার উত্তর দেয়ার ভঙ্গি বা ভাষা রাসূল (সাঃ) এর পছন্দ হয়নি। ইবনে জাওজি(রহ) বলেন, "কোন নাম না বলে শুধুমাত্র "আমি" বলাটিকে রাসূল (সাঃ) পছন্দ করেননি। কারণ এর মধ্য দিয়ে এক ধরনের অহংকারও প্রকাশ পেতে পারে। "তবে ইবনে জাবির (রাঃ) কোন ধারণা থেকে বলেছিলেন সেটি আল্লাহই ভাল জানেন। হতে পারে তা অতি বিনয়ের প্রকাশ। প্রসঙ্গক্রমে ডঃ সালমান আল আওদাহ তাঁর "ইগো" (আত্ম অহমিকার স্বরূপ)  নামক বইতে লিখেছেন; "আমি" কথাটি দিয়ে নির্দিষ্ট কাউকে বুঝা যায় না। আমি বলার পর যদি 'বুরাইদাহ' বলা হয় তবেতো একজন মানুষকেই বুঝায়, তেমনি যদি বা 'উম্মে হানি' বলা হয়, তাহলে একেবারে ভিন্ন কোন মানুষকেই বোঝানো হয়।" ঐ বইতে তিনি আরো বলেন :

"আমি" শব্দটি সবক্ষেত্রেই খারাপ অর্থে ব্যবহৃত তা কিন্তু নয়। আল কুরআনে আল্লাহর “আমি” শব্দটি (নিজেকে বুঝাতে) ৬৬ বার ব্যবহৃত হয়েছে এবং অবশ্যই ইতিবাচকভাবেই হয়েছে। আল্লাহ তা'লা "আমি" শব্দটি দিয়ে নিজের অবস্থানকে বুঝিয়েছেন এভাবেঃ" "আমিই আল্লাহ। আমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। অতএব আমার ইবাদাত করো এবং আমার স্মরণার্থে নামায কায়েম করো। "(সুরা ত্বোয়াহা, আয়াতঃ ১৪) আবার বলেছেনঃ" "আপনি আমার বান্দাহদেরকে জানিয়ে দিন যে, আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু।" (সুরা হিজর, আয়াতঃ ৪৯) " বলে দাও, হে মানব সম্প্রদায়! সত্য তোমাদের কাছে পৌঁছে গেছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। যারা এ পথের দিশা পায় তাদের নিজেদেরই কল্যাণ হয়। আর যে বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে থাকে, সে নিজের অমঙ্গলের জন্যই বিভ্রান্ত অবস্থায় ঘুরতে থাকবে। অতপর আমি যেচে পড়ে তোমাদের সমস্যাগুলো সুরাহা করবো না।" (সুরা ইউনুস : ১০৮)  আল্লাহতা'লার এ সমস্ত বাণীগুলো থেকে 'আমি'র পেছনে প্রচ্ছন্নভাবে হলেও আল্লাহর পরিচিতিটা সুস্পষ্ট। "আল্লাহই" যাঁর নাম তার আছে আরো আরো অনেক অর্থবহ অসাধারণ সুন্দর নাম যাকে একসাথে বলা হয় "আসমাউল হুসনা।" বিশেষ করে  সূরা ইখলাছ, আয়াতুল কুরসী, সূরা আর রাহমান, সূরা মূলক ও সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াতে তাঁর যে গুণবাচক মর্যাদাসম্পন্ন নাম রয়েছে তা মানব মহলেও প্রচলিত রয়েছে। তবে দুঃখের বিষয় কোন কোন ক্ষেত্রে তার যথাযথ ব্যবহার না হয়ে হচ্ছে অপব্যবহার!

 তেমনিভাবে কোন কোন ক্ষেত্রে রাসূল (সাঃ) এর নাম 'মোহাম্মদ' উল্লেখ না করেও আল্লাহ যখন তাঁকে সম্বোধন করছেন তখনো "নাম" শব্দটির একটি উহ্য পরিচিতি প্রত্যক্ষ যেমন আল্লাহ বলছেনঃ "বলুন! আমিও তোমার মতই মানুষ। আমার নিকট অহী আসে যে; তোমাদের মাবুদ একমাত্র মাবুদ, অতএব তাঁর দিকেই সোজা হয়ে থাকো এবং তার কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করো। আর মুশরিকদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ।" (হামীম আসসাজদা : ৬) এভাবে ফেরেশতাদের পরিচিতি আছে, অনেক স্থানে ফেরেশতাদের নিজস্ব বক্তব্যও আছে নিজের নাম না উল্লেখ  করে।  মানুষের জন্য আছে হুকুম পালনের ক্ষেত্রে, আনুগত্যের ক্ষেত্রে, ক্ষমা প্রার্থনার ক্ষেত্রে, বিনয়াবনত ভঙ্গিতে। এই "আমি"র ব্যবহার  আবার দুনিয়ার জীবনেও আছে  কখনো দম্ভ প্রকাশে। যেমন হতে পারে 'আমি' অমুখ শায়েখ বা 'আমি' কর্নেল অমুক, হাজী অমুক, ডাঃ তমুক ইত্যাদি। সে  যা ই হোক বিশেষণ যতই থাকুক না কেন নামের যে  প্রয়োজন আছে তা অবিসংবাদিত। আর মানুষের পরিচিতির জন্য তা অধিকতর গুরুত্ববহ। কিন্তু এ নাম ই যদি হয়ে দাঁড়ায় ঘৃণিত, বর্জনীয়, নিন্দনীয়! তখন? এজন্যই বোধকরি মানুষ বলে থাকে নামেরও তাছির আছে।

৫/ নামের তাছির বা প্রভাব কীঃ উঃ প্রচলিত কথায় এটি সর্বজনবিদিত যে "নামেরও তাছির আছে।" যার ফলে বিজ্ঞজনেরা সন্তানের নাম রাখতে ভেবেচিন্তে অর্থবোধক নাম রাখতে সচেষ্ট থাকেন। আবার অনেক সময় তাঁর ব্যতিক্রমও ঘটে। যেমন; আমার মনে পড়ছে একবার আমার এক ছাত্রের মা শিশুটিকে ভর্তি করাতে আমার বিদ্যালয়ে  নিয়ে আসেন। নাম জানতে চাইলে তিনি জানালেন, ছেলেটির নাম রেখেছেন, মাস্তান। আমি হতবাক হয়ে জানতে চাইলাম কেন? মা জননী দম্ভ ভরে বললেন, আমার ছেলে বড় হইয়া মাস্তান হইবো, আমরা ভালাই থাকমু। দেখেন না এখন মাস্তানগরই সবদিন।" স্বল্প শিক্ষিত সে মহিলার সেদিনের সে উত্তরে আমি হতভম্ব হলেও পরবর্তীতে ছেলেটির বেড়ে ওঠাসহ সমাজের কিছু একটা হোমড়াচোমড়া হবার বাস্তব চিত্র আমাকে স্তম্ভিত করেছে। বিদ্যালয়ে আমরা যতই নৈতিক শিক্ষা দেইনা কেন প্রকান্তরে ঐ নামের তাছির সত্যিই বাস্তবতা নিহিত। ঠিক এখন যেমন সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরের কথা বলছে সবাই নজীরবিহীন দুর্নীতির যে ইতিহাস তিনি গড়ে গেছেন তারই নাম "বে-নজীর !" হায়রে বে নজীর! বাবা-মা না জানি কোন আশায় এমন নাম রেখেছিলেন! শিক্ষকবৃন্দ না জানি কোন দৃশ্য দেখার জন্য এমন নামের তাছির কী হতে পারে তার অপেক্ষায় ছিলেন। সব মাত করে ভদ্রতার মুখোশ এঁটে তিনি বে-নজীরই হয়ে গেলেন। আবার ব্যতিক্রমটা দেখুন পাঠক! ওদিকে  আছে সাবেক সেনাপ্রধান" আজীজ আহমেদ।" আজীজ নামের অর্থ হল  একবাক্যে মহাপরাক্রমশালী যা একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত। এর আরো কয়েকটি অর্থ আছে। যথা: শক্তিশালী, ক্ষমতাধর, সুরক্ষাদানকারী, অপরিসীম সম্মানিত। (অনুভবে আল্লাহর নাম বৈচিত্র্যঃ শায়খ ইয়াসির কাদি, পৃঃ ১০৭)

যার ফলে হুকুম আছে আল্লাহর নামে নাম রাখতে হলে সাথে আব্দুল শব্দটি যোগ করতে হবে যার অর্থ আল্লাহর বান্দা বা গোলাম। আর আহমেদ নামের অর্থ প্রসংশিত। যা শুধুমাত্র মহানবী (সাঃ) জন্যই মনোনীত। সুতরাং একসাথে "আজিজ আহমেদ" নামের অর্থ দাঁড়াবে "প্রশংসিত ক্ষমতাধর" বা প্রশংসিত সুরক্ষাদানকারী বা প্রশংসিত পরাক্রমশালী ইত্যাদি। কিন্তু সাবেক সেনাপ্রধান "আজিজ আহমেদ ?" তার নামের তাছির কী হলো?  ঠিক এর উল্টো অর্থটাই বহন করে কুখ্যাতি নিয়ে ইতিহাস হয়ে রইলেন না কি? আহারে "নাম!" যেমনি "মীরজাফর" যার একটি সুন্দর অর্থ আছে তথাপি তা সমাজে ধিকৃত। আবুজাহেল, আবু লাহাব খারাপ অর্থেই লালিত যা আজ শুধু ধিকৃতই নয়, বর্জনীয়, নিন্দনীয়ও হয়ে আছে। 

মূলতই তাই-নাম দিয়ে নয় মানুষ  মানুষের মাঝে বেঁচে থাকে তার কর্ম দিয়ে। কর্মের ফলাফলই প্রভাব ফেলে নামের উপর আর তখনি বলা হয় নামের তাছির। কর্ম দ্বারাই উদ্ভাসিত হোক প্রিয় সব নাম। 

পরিশেষে ডঃ সালমান আল আওদাহ এর উক্তি দিয়েই ঐকমত্য প্রকাশ করছি। তিনি তাঁর "ইগো" নামক বইটিতেই বলেছেনঃ "মানুষ সহজাত ভাবেই তার অর্জনগুলোর স্বীকৃতি পেতে চায়। আরো আরো পুরস্কার ও মূল্যায়ন পেতে চায়। আল্লাহ তা'লাও এভাবেই আমাদেরে উৎসাহ দিয়েছেন। তবে সে পুরস্কারটি জাগতিক হিসেবে নয়, বরং পরকালীন হিসেবে। আমরা এ দুনিয়াতে সাময়িকভাবে যা পাই, তার মোহে আমাদের বিভোর হয়ে থাকা উচিত নয়। তাহলে দুনিয়ার অন্যান্য কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।" 

একটা 'নাম' এর সার্থকতা তখনি অর্জিতব্য যখন "জাগতিক নেশায় কাতর হয়ে বিভোর হওয়া নয় আবার তেমনি জাগতিক অর্জনকে পায়ে দলে তুচ্ছ বলে অগ্রাহ্য করাও নয়। "এর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই জাতির চালিকা বাহন হয়ে উঠুক আমাদের বর্তমান সেনাপ্রধান। তেমনিভাবে জাতির সকল কর্ণধারগণও। যাতে সত্যিকার অর্থেই প্রত্যেকের পৈতৃক নামের একটা ভাল তাছির অবলোকন করা যায়। তাই চলুন সবাই ভাল নাম রাখি, অর্থবহ নাম রাখি। এবং ভাল কাজ দিয়ে তা অর্থবহ করে তুলি তাহলেই প্রমাণিত হবে - "নামে কি বা আসে যায়!"

 

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ